রাজধানীতে সিএনজি চালকদের অবরোধ যাত্রী ভোগান্তি চরমে
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,সময় বাংলার ।
রাজধানীতে সিএনজি চালকদের সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে যাত্রীদের ভোগান্তি ছিলো চরমে বাধ্য হয়ে নির্দেশনা বাতিল করলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ(বিআরটিএ)। গ্যাস বা পেট্রলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার অটোরিকশা সিএনজি চালকদের মিটারে চলাচলের জন্য এবং মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার জন্য বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশকে মামলা সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারির প্রতিবাদে গতকাল রোববার সকাল ৭টার পর থেকে চালকরা কঠোরভাবে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। এতে সকাল সকাল যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। রাস্তা অবরোধের কারণে অনেককে পায়ে হেঁটে রওনা দিতে দেখা যায়। এছাড়া, রাজধানীর তীব্র যানজট দেখা দিলে স্কুল-কলেজ, অফিসগামী, এবং জরুরি প্রয়োজনে বাসা থেকে বের হওয়া যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। পরবর্তীততে ডিএমপির উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস) সই করা বিজ্ঞপ্তিতে চালকদের অবরোধ প্রত্যাহার করে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
এবং আন্দোলনকারীরাও আন্দোলন প্রত্যাহার করে চলে যান। অন্য দিকে যাত্রীদের অভিযোগ, “মিটারে নির্ধারিত ভাড়া ও যাত্রীদের চাহিদামতো গন্তব্যে চলাচল করতে বাধ্য থাকবে”এই ছিল থ্রি হুইলার বাহনের মূল শর্ত। কিন্তু শর্তগুলো কখনোই মানা হয় না। ভাড়া নির্ধারিত হয় চালকের ইচ্ছেমতো। এ সমস্যা একটি যৌক্তিক সমাধান যাত্রীরাও চান।
সংশ্লিষ্ট ও সচেতন মহল বলছে, দেশে পরিবহন খাতের মধ্যে থ্রি হুইলার বা সিএনজি অটোরিকশা একটি বড় পরিসরের ও অন্যতম বাহন। সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের সুবিধা-অসুবিধার কথা কোনো আইন বা নির্দেশনা জারির আগে ভাবা উচিত। এবং একটি নির্দেশনা জারির পর প্রতিবাদের মুখে নির্দেশনাটি বাতিল করাও সমীচীন নয়। বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সম্মত নির্দেশনা জারি করা উচিত। সিএনজি চালকদের দাবিগুলো কিন্তু অযৌক্তিক নয়। তাদের দাবির বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে চালক ও যাত্রীর জন্য সুষ্ঠু সমাধান করবে বলে মনে করছেন সচেতন সমাজ।
জানা যায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)’র পক্ষ থেকে গত সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে গ্যাস বা পেট্রোলে ভাড়ায় চালিত অটোরিকশাগুলো মিটারে প্রদর্শিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে মামলা ও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিলো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে মিটারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায় করলে জেল-জরিমানার নিয়ম বাতিলের দাবিতে রাজধানীজুড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র জ্যাম সৃষ্টি হয় এবং প্রায় অন্যান্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে ভোগান্তিতে পড়েন স্কুল, আফিস, জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। এ সময় অবরোধকারীদের যাত্রীসহ চলমান সিএনজি অটোরিকশাও চলাচলরোধ করতে দেখা যায়। এসময় গুলিস্তান, খিলগাঁও, মালিবাগ, হাতিরঝিল, রামপুরা, ডেমরা, শনির আখড়া, ধোলাইপাড়, গোলাপবাগ, কলেজগেট, আগারগাঁও, মিরপুরসহ পুরো রাজধানীজুড়ে তৈরি হয়ে যায় এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ।
এ সময় আন্দোলনকারীদের সাথে কথা হলে তারা জানান, সরকার নতুন যে নিয়ম করেছে তার প্রতিবাদে এই আন্দোলন। নতুন নিয়ম বাতিল, ভাড়া বৃদ্ধি ও পুলিশের হয়রানি বন্ধসহ একাধিক দাবি এ সময় তারা জানান।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সড়ক অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ভাড়ায় চালিত সিএনজি চালক লোকমান, ইসমাইল, শরীফ ইদ্রিসসহ বেশ কয়েকজন সিএনজিচালকদের সাথে কথা হলে তারা বর্তমানের এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করে বলেন, শহরে তাদের জন্য নির্ধারিত স্ট্যান্ড নাই, অতিমুনাফালোভী মালিকদের জন্য তারা বাধ্য হয়ে মিটার ছাড়া সিএনজি চালান। এছাড়াও সড়কে বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, অবৈধ স্ট্যান্ডবাজিসহ নানানভাবে হয়রানির শিকার হওয়ার ফলেই এক প্রকার তারা না চাইলেও বাধ্য হয়েই সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সিএনজি অটোরিকশা চালাতে পারেন না। এর জন্য তারা একটি সুষ্ঠু ও যৌক্তিক সমাধান চান। সাজু জমিদার নামে এক চালক বলেন, সিএনজি অটোরিকশা যখন দেশে প্রথম আসে তখন যাত্রীরা আমাদের অনেক সম্মানের সঙ্গে কথা বলতো। কিন্তু দিন দিন এমন হয়েছে যে মিটারের পরিবর্তে চুক্তিতে যাওয়ায় যাত্রীদের থেকে সেই আগের মতো সম্মান পাওয়া যায় না।
আমাদের দুঃখ অনেক যাত্রী বুঝে আবার অনেকে বুঝে না। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, জমা খরচ বাড়ছে কিন্তু আমাদের মিটারের ভাড়ার দাম বাড়ে নাই। সেই পুরাতন নিয়মেই চলছে। সময় এখন মিটারের সংস্কারের তাহলে সবাই আবার আগের মতো মিটারে সিএনজি চালাবে। মিটার সংস্কারের পরেও যদি কেউ আইন না মানে তাহলে সেই চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু এখন তো মিটারের গেলে যে ভাড়া আসে এ ভাড়ায় জমা খরচ-ই উঠে না। পেটে ভাত জুটবো কেমনে?
এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য দুপুরের আগেই জরিমানা ও মামলার বিধান দেয়া নির্দেশনাটি বাতিল করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ(ডিএমপি)’র পক্ষ থেকেও একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফোর স্ট্রোক বা থ্রি-হুইলার যান সম্পর্কিত বিআরটিএ কর্তৃক ইস্যুকৃত সাম্প্রতিক নির্দেশনাটি রোববার বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত করা হলো। অবরোধ প্রত্যাহার করে যান চলাচলে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলো।
এ বিষয় গতকাল রোববার দুপুরে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গণমাধ্যমে একটি এক বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি জানান, একটি সিন্ডিকেটের নির্দেশে সিএনজি অটোরিকশা খাতকে আলোচনায় রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের লক্ষ্যে বিআরটিএকে দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারে না চালালে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার পুরোনো আইনটি আবারো নতুন করে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করার ব্যবস্থা করে। আইন জারির পর পর কতিপয় সিন্ডিকেটধারী সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা চালকদের উস্কে দিয়ে রোববার সকাল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বন্ধ রেখে নগরজুড়ে তাণ্ডব চালায়। এমন পরিস্থিতিতে বিআরটিএ এই সিন্ডিকেটের কাছে নতিস্বীকার করে অসহায় যাত্রীদের তাণ্ডব চালানো সিএনজি অটোরিকশার চালকদের হাতে তুলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কাছে বিআরটিএ’র নতিস্বীকার নগরজুড়ে তান্ডবকারী চালকদের হাতে অসহায় যাত্রীদের তুলে দেওয়ায় বিআরটিএ’র মত এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগনের টাকায় পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যাত্রী অধিকার সুরক্ষায় নিয়োজিত এই সংগঠনটি। সেই সাথে ‘ঢাকা মহানগরীর ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কর বাসের উচ্ছেদ ঠেকাতে গোলাপি কালার, বাস সংকটে ভয়াবহ যাত্রী দুর্ভোগ’ ও সিএনজি অটোরিকশা চালকদের তান্ডব, অসহায় যাত্রীদের তান্ডবকারী চালকদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আজ সকাল ১১.০০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ট্রাফিক মো. সরওয়ার বলেন, “অটোরিকশা চালকরা ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করলে আমরা বিষয়টি নিয়ে বিআরটিএর সঙ্গে কথা বলি। জেল জরিমানার বিষয়ে যে চিঠিটি বিআরটিএ থেকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি আজ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।”
উল্লেখ্য, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী প্রায় ২৮ হাজার অটোরিকশার জন্য পৃথক নীতিমালা রয়েছে। এসব অটোরিকশাকে কন্ট্রাক্ট ক্যারিয়েজ বা ভাড়ায় চালিত যান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নীতিমালা অনুসারে, সিএনজি ও পেট্রলচালিত অটোরিকশার ভাড়া ও মালিকের দৈনিক জমা নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে অটোরিকশার মালিকের জন্য দৈনিক জমা নির্ধারিত আছে ৯০০ টাকা। তবে চালকদের অভিযোগ, মালিকেরা দিনে দুই বেলায় চালকের কাছে অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। অটোরিকশার বর্তমান সর্বনিম্ন (প্রথম দুই কিলোমিটার) ভাড়া ৪০ টাকা; অর্থাৎ একজন যাত্রী চাইলে ৪০ টাকায় অটোরিকশা ভাড়া করার সুযোগ পাবেন। যাত্রীদের অভিযোগ, ১৫০ টাকার নিচে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করা যায় না। দুই কিলোমিটারের পরের প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ১২ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তা কেউ মানেন না। জানা যায়, ২০০৩ সালের দিকে রাজধানী ঢাকা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে টু–স্ট্রোক বেবিট্যাক্সি তুলে দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালু করে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার। মিটারে নির্ধারিত ভাড়া ও যাত্রীদের চাহিদামতো গন্তব্যে চলাচল করতে বাধ্য থাকবে—এই ছিল মূল শর্ত। কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, শর্তগুলো কখনোই মানা হয় না। ভাড়া নির্ধারিত হয় চালকের ইচ্ছেমতো।