মুখ থুবরে পড়ে আছে খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মাতৃভাষা শিক্ষা পাঠ দান কার্যক্রম
জীতেন বড়–য়া,খাগড়াছড়ি
খাগড়াছড়িতে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে স্ব স্ব মাতৃভাষার প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় মুখ থুবরে পড়ে আছে এ ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম। এতে করে দীর্ঘ নয় বছরেও আলোর মুখ দেখছে না ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পাঠদান কার্যক্রম। সরকারী ভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না থাকা ও ক্লাশ রুটিনে বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত না করায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা; এ তিন সম্প্রদায়ের জাতি গোষ্ঠি শিশুদের স্ব স্ব মাতৃভাষার শিক্ষা। ম্যানুয়েল তৈরি করে শিক্ষকদের সরকারীভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া ও ক্লাশ রুটিনে বিষয়টি অর্ন্তভুক্তির দাবী জানিয়েছেন শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ সুত্রে জানাযায়,ঝড়ে পড়া রোধ করার জন্য পাহাড় আর সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের স্ব স্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক থেকে শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিতে মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়। ২০১৭ সালে মাতৃভাষার শিক্ষা চালু হলেও এতোদিনেও শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

সরকার দেশের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্টি সম্প্রদায়ের জনগোষ্টির ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় নিজ মাতৃভাষায় ১ম শ্রেণী থেকে ৩য় শ্রেনী পর্যন্ত পাহাড় আর সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিলেও খাগড়াছড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে স্ব স্ব মাতৃভাষার প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় মুখ থুবরে পড়ে আছে এ ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম। স্ব স্ব মাতৃভাষার প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায়, খাগড়াছড়ির অধিকাংশ বিদ্যালয় গুলোতে পড়ানো হয়না মাতৃভাষার বই গুলো। প্রাক প্রাথমিক থেকে ৩য় শ্রেনী পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার বই গুলোপড়ে রয়েছে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে । অনেক বিদ্যলয়ে নেই স্ব স্ব মাতৃভাষার শিক্ষক আর অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নেই প্রশিক্ষণ। তাই মাতৃভাষার বই গুলো পড়ানো যাচ্ছে না। এ ছাড়া খাগড়াছড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাশ রুটিনে বিষয়টি অর্ন্তভুক্তি না থাকায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এ ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম। খাগড়াছড়ির আপার পেড়াছড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেনু চাকমা ও খাগড়াপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশা প্রিয় ত্রিপুরা বলেন,বিদ্যালয় গুলোতে স্ব স্ব মাতৃভাষার শিক্ষক না থাকা ও ক্লাশ রুটিনে বিষয়টি অর্ন্তভুক্তি না থাকায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এ ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম। শিক্ষকরা যে বিদ্যালয়ে স্ব স্ব মাতৃভাষার উপর শিক্ষক নেই সেই সব বিদ্যলয়ে মাতৃভাষারার শিক্ষক পদায়ন ও পিটিআই এর মাধ্যমে শিক্ষকদের নিজ নিজ মাতৃভাষার উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা এবং ক্লাশ রুটিনে বিষয়টি অর্ন্তভুক্তির অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমল মতি শিশুরা জানান তারা নিজ নিজ মাতৃভাষায় কথা বলতে পাড়লেও লিখতে ও পড়তে পারে না ।
ভাষা গবেষক ও এনসিটিবি‘র ত্রিপুরা প্যানেল সদস্য মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা ও এনসিটিবি’র চাকমা ভাষার প্যানেল সদস্য আর্য মিত্র চাকমা মাতৃভাষার শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বর্ণমালার সাথে অপরিচিতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষন না থাকা এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে ৯ বছরেও স্কুলে মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হচ্ছেনা। প্রকৃত অর্থে অনেকটাই দায়সারাভাবে চলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির প্রাথমিক শিক্ষা। তাই তারা মাত ৃভাষাভিত্তিক প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষন কার্যক্রমে (পিটিআই) তা অন্তর্ভূক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। শিক্ষক প্রশিক্ষন ইনস্টিটিউট এর তত্তাবধায়ক, রুমা দাশ জানান কয়েক বছর আগে শিক্ষকদের ভাষাভিত্তিক প্রশিক্ষন দেয়া হলেও এখন তা বন্ধ রয়েছে।তা ছাড়া দক্ষ প্রশিক্ষক এরও অভাব রয়েছে । তিনি বলেন মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য যে বিদ্যালয়ে যে ভাষার শিক্ষার্থী আছে সেই বিদ্যালয়ে সেই ভাষার শিক্ষক পদায়ন ও নিজ নিজ মাতৃভাষার উপর প্রশিক্ষিত করা গেলে সরকারের এ উদ্যেগের সফলতা আসবে ।
মূলত: দক্ষ কোন প্রশিক্ষক না থাকার কারনে এক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই বলে মনে করেন খাগড়াছড়ির জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: সফিকুল ইসলাম।তা ছাড়া পার্বত্য জেলা পরিষদ গুলোও এ বিষয়ে বাস্তব ভিত্তিক কোন প্রদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে জানান তিনি । এ দু কর্মকর্তাই বিষয়টি অধিদপ্তরকেও জানানোর দাবী করেন।
এদিকে সরকার ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক, ২০১৮ সালে প্রথম শ্রেণি,২০১৯ সালে দ্বিতীয় শ্রেণি ও ২০২০ সালে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে।
মাতৃভাষার শিক্ষক পদায়ন ও মাতৃভাষার শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসই করার জন্য ম্যানুয়েল তৈরি করে শিক্ষকদের পিটিআই এর মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে; এমটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।